বিজ্ঞানীরা ঠিক এই অসম্ভবকেই সম্ভব করতে চলেছেন। ভবিষ্যতের যেকোনও বড় ভাইরাস মহামারী বা আউটব্রেক থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে এক যুগান্তকারী 'ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিন' (Universal Vaccine) প্রযুক্তি নিয়ে এসেছেন গবেষকেরা।
করোনা অতিমারীর সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা আমরা কেউই হয়তো কোনওদিন ভুলব না। একটা অজানা ভাইরাস কীভাবে গোটা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তা আমাদের সবার চেনা। প্রতিনিয়ত রূপ বদলে নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি করে বিজ্ঞানীদের রীতিমতো নাকানিচোবানি খাইয়েছে এই ভাইরাস। আজ একটা টিকার ফর্মুলা তৈরি হলে, কালই ভাইরাসটি নিজেকে বদলে ফেলে টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেমন হতো, যদি এমন একটা 'ম্যাজিক টিকা' থাকত যা শুধু বর্তমান করোনা নয়, ভবিষ্যতে আসতে চলা যেকোনো রূপবদলকারী ভাইরাসের আক্রমণকেও এক তুড়িতে রুখে দিতে পারত?
বিজ্ঞানীরা ঠিক এই অসম্ভবকেই সম্ভব করতে চলেছেন। ভবিষ্যতের যেকোনও বড় ভাইরাস মহামারী বা আউটব্রেক থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে এক যুগান্তকারী 'ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিন' (Universal Vaccine) প্রযুক্তি নিয়ে এসেছেন গবেষকেরা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের সহযোগী সংস্থা 'ডিওসিনভ্যাক্স' (DIOSynVax)-এর তৈরি এই ইউনিভার্সাল সারবেকো করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনের প্রথম মানব ট্রায়াল বা হিউম্যান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। 'জার্নাল অব ইনফেকশন'-এ প্রকাশিত এই গবেষণার ফল জানিয়েছে, এই টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এর কোনও উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
কী এই 'ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিন' এবং কীভাবে কাজ করে?
সাধারণত আমরা যে ফ্লু বা কোভিডের টিকা নিই, সেগুলো তৈরি হয় আগে থেকে চেনা কোনও নির্দিষ্ট ভাইরাসের স্ট্রেন বা ভ্যারিয়েন্টকে মাথায় রেখে। কিন্তু ভাইরাস যখন ক্রমাগত মিউটেশন বা রূপবদল করতে থাকে, তখন প্রচলিত টিকাগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়। অর্থাৎ ভাইরাস আগে আগে দৌড়ায়, আর বিজ্ঞানীরা টিকা আপডেট করতে তার পেছনে ছোটেন।
এই নতুন প্রযুক্তিতে এই চাপটা কমাবে, বলা ভাল ভাইরাস রূপ বদল করলেও আর দৌড় লাগাতে হবে না দ্রুত নতুন টিকা আনতে, এই সমস্যা থেকে মুক্তি দেবে। অর্থাৎ যতশক্তিশালী বা বিপজ্জনক ভাইরাসই আসুক না কেন, এই এআই প্রযুক্তিতে তৈরি টিকায় জব্দ হবে সহজেই।
কারণ:
- এআই-ডিজাইনড 'সুপার-অ্যান্টিজেন': বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এবং কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্য নিয়েছেন। সারা বিশ্বের সারবেকো করোনাভাইরাস (যার মধ্যে কোভিড-১৯ এবং সার্স ভাইরাসও রয়েছে) গোত্রের সবকটি ভাইরাসের জিনগত তথ্য বা জেনেটিক সিকোয়েন্স অ্যানালিসিস করা হয়েছে।
- ভবিষ্যতের ভাইরাসের আগাম দাওয়াই: মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে এমন একটি 'সুপার-অ্যান্টিজেন' (Super-antigen) ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়েছে, যা এই গোত্রের সমস্ত ভাইরাসের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোকে চিনে নিতে পারে। এমনকি যে ভাইরাসগুলো এখনও প্রকৃতিতে জন্ম নেয়নি বা পশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়নি, সেগুলোর বিরুদ্ধেও এটি মানবশরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি তৈরি করতে সক্ষম।
প্রথম মানব ট্রায়ালে কী দেখা গেল?
যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন এবং কেমব্রিজের 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ' (NIHR)-এর ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ফেসিলিটিতে এই ট্রায়াল চালানো হয়। ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৩৯ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকের ওপর এই টিকা পরীক্ষা করা হয়েছিল।
ফলাফলে দেখা গেছে:
১. টিকাটি স্বেচ্ছাসেবকদের শরীরে অত্যন্ত শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
২. এটি কেবল কোভিড-১৯ বা সার্স (SARS) ভাইরাসের বিরুদ্ধেই নয়, বরং বাদুড়ের শরীরে থাকা এমন কিছু ভাইরাসের বিরুদ্ধেও অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে যা ভবিষ্যতে মানুষের শরীরে মহামারী ছড়াতে পারত।
৩. সবচেয়ে বড় কথা, কম্পিউটারের নকশা করা কোনও ভ্যাকসিনের সক্রিয় উপাদান মানুষের শরীরে সফলভাবে কাজ করার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটাই প্রথম।
সুচ বা সিরিঞ্জের ভয় আর নেই!
এই ভ্যাকসিনের আরেকটি বড় চমক হল এর প্রয়োগ পদ্ধতি। এটি কোনও ট্র্যাডিশনাল নিডল বা সুচের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি। এর বদলে 'মাইক্রো ফ্লুইড জেট' (Micro fluid jet) প্রযুক্তির সাহায্যে ত্বকের মাধ্যমে সরাসরি শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছে। যারা সুচ ফোটানোর ভয়ে ইঞ্জেকশন নিতে ভয় পান, তাদের জন্য এটি দারুণ সুখবর। এর ফলে খুব দ্রুত এবং গণহারে টিকাকরণ করা সম্ভব হবে।
কেন এই আবিষ্কার গেম-চেঞ্জার?
গবেষক দলের প্রধান এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হীনি (Professor Jonathan Heeney) বলেন, "আমরা ভ্যাকসিন তৈরির ধারণাকেই বদলে দিয়েছি। আগে ভাইরাস আসার পর আমরা ওষুধ খুঁজতাম, আর এখন আমরা ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করে রাখছি।"
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গবেষক অধ্যাপক সল ফস্ট (Professor Saul Faust) জানিয়েছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা, করোনা বা ইবোলার মতো ভাইরাসগুলো যেভাবে দ্রুত ছড়ায়, তাতে মহামারী শুরু হওয়ার আগেই যদি এই ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিন তৈরি করে রাখা যায়, তবে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে। লকডাউনের মতো কঠিন পরিস্থিতি এড়ানো যাবে এবং দেশের অর্থনীতিও ভেঙে পড়বে না।
পরবর্তী ধাপ কী?
মানুষের ওপর পরীক্ষার আগে পশুদের ওপরেও এই টিকার ট্রায়াল দারুণ সফল হয়েছিল। তবে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য বাজারে আসার আগে এটির আরও কিছু পরীক্ষা বাকি রয়েছে। খুব শীঘ্রই এর 'ফেজ ২' (Phase 2) ট্রায়াল শুরু হবে, যেখানে অনেক বড় এবং বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা ক্ষমতা যাচাই করা হবে।
এক নজরে ডিওসিনভ্যাক্স (DIOSynVax)
২০১৭ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় এই ডিজিটাল ইমিউন অপ্টিমাইজড সিন্থেটিক ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী সংস্থাটি গড়ে ওঠে। এই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা বর্তমানে সাধারণ সিজনাল ফ্লু, প্যানডেমিক ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ইবোলার মতো হেমোরেজিক ফিভার ভাইরাসেরও ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চালাচ্ছে।
ভবিষ্যতের অজানা কোনও অতিমারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই 'সুপার-অ্যান্টিজেন' প্রযুক্তি যে মানবজাতির জন্য এক অমোঘ অস্ত্র হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য!
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক। এটি কোনও চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য নানা মিডিয়ায় প্রকাশিত বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে লেখা, যা আলাদা করে দ্য ওয়ালের তরফে যাচাই করা হয়নি।
Note: This report is intended for informational purposes only and is not a substitute for medical advice. It is based on statements published across social media and various other media platforms, which have not been independently verified by The Wall.


0 মন্তব্যসমূহ